সাইফুল্লাহ হাসান::
‘কৃষক’ -শব্দটা শুনলেই কেন যেন আমার ভেতরে অন্যরকম একটা অনুভূতি তৈরি হয়। হয়তো সাংবাদিকতার জীবনে খুব কাছ থেকে কৃষককে দেখার সুযোগ হয়েছিল বলেই।
সাংবাদিকতায় থাকার সময় কৃষি নিয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন করেছি। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গলের লেবু, আনারস, জুড়ী উপজেলার কমলালেবু- এসব নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় একাধিক প্রতিবেদন করেছি। হাকালুকি হাওরের কৃষকদের নিয়েও কাজ করেছি। সেখানে কৃষকরা ধানসহ বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি সূর্যমুখী, বাদামসহ নানা ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন।
নিউজ করতে গিয়ে আমি শুধু ফসলের ছবি তুলে বা কৃষকের বক্তব্য নিয়ে ফিরে আসিনি। চেষ্টা করেছি কৃষকের একদম কাছাকাছি যেতে। জানতে চেয়েছি তাদের সমস্যা, অভাব-অভিযোগ, প্রত্যাশা এবং না-পাওয়ার গল্প।
তখন অনেক কৃষকই একটি অভিযোগ করতেন- সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা কৃষি অফিসের সহযোগিতা নাকি সব কৃষক সমানভাবে পান না। কারও সামাজিক পরিচিতি, কারও রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অন্য কোনো প্রভাবের কারণে কেউ কেউ তুলনামূলক বেশি সুযোগ পান- এমন অভিযোগও শুনেছি অনেকের কাছ থেকে।
একজন কৃষক সরকারি কোনো বিশেষ মর্যাদা পাওয়ার জন্য অফিস ঘেরাও করবেন না। সচিবালয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন না। দিনের পর দিন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনও করবেন না। তারা শুধু চান- তাদের শ্রমের মর্যাদা দেওয়া হোক, তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা যেন ন্যায্যভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়।
★আর কৃষকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা আজও মনে পড়ে।
একবার জুড়ী উপজেলায় কমলার বাগানে নিউজ করতে গিয়েছি। অনেক দূর থেকে গিয়েছি দেখে কৃষক ভাই বলতেন, ‘আগে তুমি খাও, তারপর নিউজ করো।’ এরপর বক্তব্য নিয়েছি, ভিডিও করেছি, ছবি তুলেছি, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছি।
ফেরার সময় দেখতাম- ব্যাগভর্তি কমলা হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন। কখনো লেবু, কখনো আনারস। বলছেন, ‘এগুলো নিয়ে যান।’
আমি অনেক সময় চেষ্টা করেছি সেই ফসলের সমপরিমাণ মূল্য দিয়ে আসতে। কখনো কৃষকের পরিবারের ছোট বাচ্চা কিংবা বৃদ্ধ কেউ থাকলে তাদের হাতেও সেই টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়- তখন সেই কৃষকই রাগ করতেন!বলতেন, ‘টাকা দিলেন কেন? এগুলো তো আপনার জন্য।’
একটু ভেবে দেখুন, মানুষটি কি শুধু নিজের প্রচার বা বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের ব্যাগভর্তি ফসল দিচ্ছেন?
একদমই না! এর মধ্যে একটা ভালো লাগা আছে। আন্তরিকতা আছে। অতিথিপরায়ণতা আছে। আর আছে মানুষকে সম্মান দেওয়ার এক অসাধারণ মানসিকতা।
এই মানুষগুলোই আমাদের খাবার উৎপাদন করেন। আমরা বাজারে গিয়ে টাকা দিয়ে ফসল /শাক সবজি কিনে নিয়ে আসি। কিন্তু সেই ফসলের পেছনে যে কৃষকের মাসের পর মাসের শ্রম, ঘাম, আমরা কি মনে রাখি।
একজন কৃষক যখন মাঠে দাঁড়িয়ে ফসল ফলান, তখন তিনি শুধু নিজের পরিবারের জন্য উৎপাদন করেন না। তার উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের প্রতিদিনের খাবার, আমাদের বাজার, আমাদের জীবনযাত্রা।
আমরা অনেক সময় নিজেদের পেশা, পরিচয় কিংবা অবস্থান নিয়ে গর্ব করি। অথচ আমাদের সবার জীবনের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক বহু পুরোনো। আমাদের পরিবারের কোনো না কোনো প্রজন্ম কৃষির সঙ্গে যুক্ত ছিল, এখনো আছে। এই মাটির সঙ্গে, কৃষির সঙ্গে, কৃষকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কোনো নতুন সম্পর্ক নয়।
তাই কৃষককে শুধু একজন ‘উৎপাদক’ হিসেবে দেখলে হবে না। তাকে দেখতে হবে একজন অন্নদাতা হিসেবে।
সরকারের কৃষি বিভাগ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান যদি প্রতিটি কৃষকের প্রাপ্য অধিকার, সুযোগ ও সম্মান নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে কৃষকের প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান।
কৃষক হয়তো অনেক কিছু চাইবেন না। তিনি হয়তো বড় কোনো দাবি নিয়ে আপনার দরজায় দাঁড়াবেন না। কিন্তু তাই বলে তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার কমে যায় না।
বরং যে মানুষটি নিজের ঘাম ঝরিয়ে আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করেন, তার প্রাপ্য মর্যাদাটুকু নিশ্চিত করা আমাদেরই দায়িত্ব।
কৃষকের হাতে শুধু ফসল নয়- আমাদের খাদ্য, অর্থনীতি ও দেশের ভবিষ্যৎও রয়েছে। তাই কৃষিকে অবহেলা করা মানে নিজেদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। কৃষককে প্রাপ্য মর্যাদা ও ন্যায্য সহযোগিতা দিতে হবে। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলেই নিরাপদ থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ।
লেখক: সাইফুল্লাহ হাসান, প্রবাসী সাংবাদিক

