জুতা আবিষ্কার: প্রকৃতির সঙ্গে বিচ্ছেদ, নাকি জীবনের সুরক্ষা?

 

জুতা আবিষ্কার: প্রকৃতির সঙ্গে বিচ্ছেদ, নাকি জীবনের সুরক্ষা?  আব্দুল্লাহ্ আল মাহি::  মানবসভ্যতা যত দিন এগিয়ে যাচ্ছে, ততই যেন আমরা কৃত্রিমতার দিকে ঝুঁকে পড়ছি। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে প্রকৃতি থেকে আমাদের দূরত্ব। এই দূরত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকগুলোর একটি হলো জুতা।  একসময় খালি পায়ে মাটি ও ঘাসের ওপর হাঁটার মধ্যে যে আনন্দ ছিল, আজ তা আমাদের অনেকের কাছেই প্রায় অচেনা। শীতের সকালের শিশিরভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটা, নরম মাটির স্পর্শ এসবের মধ্যে যে এক ধরনের তৃপ্তি আছে, তা অনুভব না করলে বোঝানো কঠিন। মানুষ তো দিনশেষে প্রকৃতিরই সন্তান। তাই প্রকৃতির সঙ্গে এই বিচ্ছিন্নতা কোথাও যেন আমাদের ভেতরেও একটা শূন্যতা তৈরি করে।  কিন্তু বিধিবাম! মানুষকে প্রকৃতির এত কাছে থাকতে দেওয়ার মাঝেই সভ্যতার আরেক আবিষ্কার এসে দাঁড়াল জুতা।  সাহিত্য ও কবিতায়ও তাই প্রকৃতি থেকে মানুষের এই দূরে সরে যাওয়া নিয়ে আক্ষেপের কথা বারবার এসেছে। কিন্তু একটু অন্যভাবে ভাবলে প্রশ্ন জাগে যে জুতা কি সত্যিই শুধু আমাদের প্রকৃতি থেকে দূরে সরিয়েছে? নাকি অজান্তেই আমাদের কিছু ভয়ংকর রোগ থেকেও রক্ষা করেছে?  মানুষ খুবই সংবেদনশীল একটি প্রাণী। আমাদের চারপাশের মাটি, পানি ও পরিবেশে অসংখ্য অণুজীব(Microorganism) বাস করে। তাদের অনেকগুলো নিরীহ( Normal Flora), আবার কিছু কিছু মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। মাটির সংস্পর্শের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে এমন জীবাণু ও পরজীবীর মধ্যে Bacillus anthracis, Clostridium tetani এবং Clostridium perfringens উল্লেখযোগ্য। এগুলো যথাক্রমে Anthrax, Tetanus ও Gas gangrene-এর মতো গুরুতর রোগ সৃষ্টি করে।  বিশেষ করে টিটেনাসের কথাই ধরা যাক। মাটিতে থাকা Clostridium tetani-এর স্পোর কোনো ক্ষতস্থানের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে ভয়াবহ টিটেনাস রোগ হতে পারে। তাই মাটি বা নোংরা বস্তুর সংস্পর্শে ক্ষত তৈরি হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী টিটেনাসের টিকা বা অন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অর্থাৎ, আমাদের পায়ের সঙ্গে মাটির সরাসরি সংস্পর্শ কমিয়ে দেওয়ার মতো সাধারণ একটি বিষয়ও সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।  শুধু ব্যাকটেরিয়াই নয়, মাটির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু পরজীবীও মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যেমন Ancylostoma duodenale ও Ascaris lumbricoides মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরজীবী। বিশেষ করে hookworm-এর লার্ভা মাটি থেকে খালি পায়ের ত্বক ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ, আমরা যে মাটিকে এত আপন মনে করি, সেই মাটিই কখনো কখনো রোগের বাহক হয়ে উঠতে পারে।  এখানেই জুতার গুরুত্বটা নতুনভাবে সামনে আসে।  আমরা হয়তো খালি পায়ে হাঁটার সেই অনুভূতিটা হারিয়েছি, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছি এক ধরনের অদৃশ্য সুরক্ষা। জুতা আমাদের পায়ের ত্বককে মাটি, ময়লা ও বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু ও পরজীবীর সরাসরি সংস্পর্শ থেকে অনেকটাই দূরে রাখে। Public Health-এর ভাষায়, রোগ প্রতিরোধের এমন অনেক ব্যবস্থা আছে যেগুলোর সাফল্য আমরা কখনো চোখে দেখি না, কারণ সফল হলে রোগটাই হয় না।  আজ আমরা হয়তো কল্পনাও করতে পারি না, এমন একটা সময় ছিল যখন কলেরা বা অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব পুরো জনপদকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারত। বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, টিকাদান, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি এমন অসংখ্য ছোট ছোট পরিবর্তন ধীরে ধীরে মানুষের জীবনকে নিরাপদ করেছে। এগুলোর কোনোটি হয়তো একা কোনো অলৌকিক পরিবর্তন ঘটায়নি, কিন্তু সম্মিলিতভাবে মানবসভ্যতার আয়ু ও জীবনযাত্রায় বিপুল পরিবর্তন এনেছে।  জুতাও সেই দীর্ঘ যাত্রারই একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ।  তাই হয়তো জুতাকে শুধু সভ্যতার কৃত্রিমতার প্রতীক হিসেবে দেখলে গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। হ্যাঁ, জুতা আমাদের মাটি থেকে দূরে সরিয়েছে। শিশিরভেজা ঘাসের স্পর্শ থেকে, নরম মাটির অনুভূতি থেকে হয়তো কিছুটা বিচ্ছিন্ন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই সামান্য আবিষ্কারটি আমাদের অজানা অসংখ্য ঝুঁকি থেকেও রক্ষা করেছে।  প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা আমাদের প্রয়োজন, কিন্তু প্রকৃতির সবকিছুই যে আমাদের জন্য নিরাপদ তা কিন্তু নয়।  তথ্যসূত্র: Parks Textbook of Preventive and Social Medicine.  লেখা: আব্দুল্লাহ্ আল মাহি MBBS ৪র্থ বর্ষ সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ।
এআই এর সাহায্য নিয়ে ছবিটি তৈরী করা হয়েছে

আব্দুল্লাহ্ আল মাহি::

মানবসভ্যতা যত দিন এগিয়ে যাচ্ছে, ততই যেন আমরা কৃত্রিমতার দিকে ঝুঁকে পড়ছি। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে প্রকৃতি থেকে আমাদের দূরত্ব। এই দূরত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকগুলোর একটি হলো জুতা।

একসময় খালি পায়ে মাটি ও ঘাসের ওপর হাঁটার মধ্যে যে আনন্দ ছিল, আজ তা আমাদের অনেকের কাছেই প্রায় অচেনা। শীতের সকালের শিশিরভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটা, নরম মাটির স্পর্শ এসবের মধ্যে যে এক ধরনের তৃপ্তি আছে, তা অনুভব না করলে বোঝানো কঠিন। মানুষ তো দিনশেষে প্রকৃতিরই সন্তান। তাই প্রকৃতির সঙ্গে এই বিচ্ছিন্নতা কোথাও যেন আমাদের ভেতরেও একটা শূন্যতা তৈরি করে।

কিন্তু বিধিবাম! মানুষকে প্রকৃতির এত কাছে থাকতে দেওয়ার মাঝেই সভ্যতার আরেক আবিষ্কার এসে দাঁড়াল জুতা।

সাহিত্য ও কবিতায়ও তাই প্রকৃতি থেকে মানুষের এই দূরে সরে যাওয়া নিয়ে আক্ষেপের কথা বারবার এসেছে। কিন্তু একটু অন্যভাবে ভাবলে প্রশ্ন জাগে যে জুতা কি সত্যিই শুধু আমাদের প্রকৃতি থেকে দূরে সরিয়েছে? নাকি অজান্তেই আমাদের কিছু ভয়ংকর রোগ থেকেও রক্ষা করেছে?

মানুষ খুবই সংবেদনশীল একটি প্রাণী। আমাদের চারপাশের মাটি, পানি ও পরিবেশে অসংখ্য অণুজীব(Microorganism) বাস করে। তাদের অনেকগুলো নিরীহ( Normal Flora), আবার কিছু কিছু মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। মাটির সংস্পর্শের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে এমন জীবাণু ও পরজীবীর মধ্যে Bacillus anthracis, Clostridium tetani এবং Clostridium perfringens উল্লেখযোগ্য। এগুলো যথাক্রমে Anthrax, Tetanus ও Gas gangrene-এর মতো গুরুতর রোগ সৃষ্টি করে।

বিশেষ করে টিটেনাসের কথাই ধরা যাক। মাটিতে থাকা Clostridium tetani-এর স্পোর কোনো ক্ষতস্থানের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে ভয়াবহ টিটেনাস রোগ হতে পারে। তাই মাটি বা নোংরা বস্তুর সংস্পর্শে ক্ষত তৈরি হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী টিটেনাসের টিকা বা অন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অর্থাৎ, আমাদের পায়ের সঙ্গে মাটির সরাসরি সংস্পর্শ কমিয়ে দেওয়ার মতো সাধারণ একটি বিষয়ও সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু ব্যাকটেরিয়াই নয়, মাটির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু পরজীবীও মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যেমন Ancylostoma duodenale ও Ascaris lumbricoides মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরজীবী। বিশেষ করে hookworm-এর লার্ভা মাটি থেকে খালি পায়ের ত্বক ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ, আমরা যে মাটিকে এত আপন মনে করি, সেই মাটিই কখনো কখনো রোগের বাহক হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই জুতার গুরুত্বটা নতুনভাবে সামনে আসে।

আমরা হয়তো খালি পায়ে হাঁটার সেই অনুভূতিটা হারিয়েছি, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছি এক ধরনের অদৃশ্য সুরক্ষা। জুতা আমাদের পায়ের ত্বককে মাটি, ময়লা ও বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু ও পরজীবীর সরাসরি সংস্পর্শ থেকে অনেকটাই দূরে রাখে। Public Health-এর ভাষায়, রোগ প্রতিরোধের এমন অনেক ব্যবস্থা আছে যেগুলোর সাফল্য আমরা কখনো চোখে দেখি না, কারণ সফল হলে রোগটাই হয় না।

আজ আমরা হয়তো কল্পনাও করতে পারি না, এমন একটা সময় ছিল যখন কলেরা বা অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব পুরো জনপদকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারত। বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, টিকাদান, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি এমন অসংখ্য ছোট ছোট পরিবর্তন ধীরে ধীরে মানুষের জীবনকে নিরাপদ করেছে। এগুলোর কোনোটি হয়তো একা কোনো অলৌকিক পরিবর্তন ঘটায়নি, কিন্তু সম্মিলিতভাবে মানবসভ্যতার আয়ু ও জীবনযাত্রায় বিপুল পরিবর্তন এনেছে।

জুতাও সেই দীর্ঘ যাত্রারই একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাই হয়তো জুতাকে শুধু সভ্যতার কৃত্রিমতার প্রতীক হিসেবে দেখলে গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। হ্যাঁ, জুতা আমাদের মাটি থেকে দূরে সরিয়েছে। শিশিরভেজা ঘাসের স্পর্শ থেকে, নরম মাটির অনুভূতি থেকে হয়তো কিছুটা বিচ্ছিন্ন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই সামান্য আবিষ্কারটি আমাদের অজানা অসংখ্য ঝুঁকি থেকেও রক্ষা করেছে।

প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা আমাদের প্রয়োজন, কিন্তু প্রকৃতির সবকিছুই যে আমাদের জন্য নিরাপদ তা কিন্তু নয়।


তথ্যসূত্র: Parks Textbook of Preventive and Social Medicine.


লেখা: আব্দুল্লাহ্ আল মাহি

MBBS ৪র্থ বর্ষ, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ।