![]() |
| ছবি: এআই |
আব্দুল্লাহ আল মাহি::
আচ্ছা, কেউ যদি এমন কিছু শুনতে পায় যা সে ছাড়া অন্য কেউ শুনছে না, কিংবা এমন কিছু বিশ্বাস করে যা বারবার ভুল প্রমাণ করার পরও সে বিশ্বাস করেই যায়—তাহলে আমরা সাধারণত কী করি?
অনেক সময় তাকে “পাগল”, কিংবা “জ্বীনে ধরা” বলে এড়িয়ে যাই। অথচ বাস্তবে সে হয়তো একটি গুরুতর মানসিক রোগে ভুগছে, যার নাম সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia)।
আজ আমরা এই রোগটি সম্পর্কে একটু সহজভাবে জানার চেষ্টা করবো।
সিজোফ্রেনিয়া কী?
সিজোফ্রেনিয়া হলো একটি মানসিক রোগ, যেখানে একজন মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ এবং বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতায় ব্যাঘাত ঘটে। অনেক সময় রোগী বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না।
রোগের প্রধান লক্ষণসমূহ
সিজোফ্রেনিয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে রোগটি শনাক্ত করা হয় (Diagnostic Criteria)
1. ডিলিউশন (Delusion)
এটি এক ধরনের ভুল বিশ্বাস যা যুক্তি বা প্রমাণ দিয়েও পরিবর্তন করা যায় না।
1. হ্যালুসিনেশন (Hallucination)
বাস্তবে কোনো কিছু না থাকলেও সেটি অনুভব করা।
সিজোফ্রেনিয়ায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় অডিটরি হ্যালুসিনেশন, অর্থাৎ রোগী গায়েবি আওয়াজ শুনতে পান।
1. অগোছালো কথাবার্তা (Disorganized Speech)
অসংলগ্নভাবে কথা বলা।
1. অগোছালো আচরণ (Disorganized Behaviour)
উদ্দেশ্যহীন বা অস্বাভাবিক আচরণ করা।
1. আবেগ বা আগ্রহ কমে যাওয়া
আগে যেসব বিষয়ে আগ্রহ ছিল, ধীরে ধীরে সেগুলো থেকে দূরে সরে যাওয়া।
লক্ষণগুলোর ধরন
সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণগুলোকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
1. পজিটিভ লক্ষণ
অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থার বাইরে অতিরিক্ত কিছু যোগ হওয়া।
ক) গায়েবি আওয়াজ শোনা (Auditory Hallucination)
রোগীর মনে হতে পারে কেউ তার সাথে কথা বলছে কিংবা কয়েকজন মানুষ তাকে নিয়ে আলোচনা করছে।
খ) চিন্তা সম্প্রচার (Thought Broadcasting)
রোগীর মনে হতে পারে তার মনের চিন্তাগুলো অন্যরা জেনে যাচ্ছে কিংবা কেউ তার চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করছে।
গ) নিয়ন্ত্রিত অনুভূতি (Controlled Feelings)
রোগী ভাবতে পারেন তার আবেগ বা অনুভূতি তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই; বরং বাইরের কেউ সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে।
ঘ) মিথ্যা উপলব্ধি (Delusional Perception)
বাস্তব কোনো ঘটনা দেখে বা শুনে রোগী এমন অর্থ বের করেন, যার বাস্তব ভিত্তি নেই।
1. নেগেটিভ লক্ষণ
অর্থাৎ স্বাভাবিক কিছু ধীরে ধীরে কমে যাওয়া।
ক) Apathy : ইমোশনাল এক্টিভিটি নাই। তার সামনে আগুনে পুড়ে গেলেও তার কোনো এক্টিভিটি নেই।
খ) Avolition
কাজ করার ইচ্ছা ও আগ্রহ কমে যাওয়া।
গ) Alogia
কম কথা বলা।
ঘ) Anhedonia
যেসব বিষয় আগে আনন্দ দিত, সেগুলোতে আর আনন্দ অনুভব না করা( Lack of Interest)
রোগের সম্ভাব্য কারণসমূহ
সিজোফ্রেনিয়ার নির্দিষ্ট একক কারণ নেই। বিভিন্ন জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক কারণ একসাথে ভূমিকা রাখতে পারে।
1. জেনেটিক বা বংশগত কারণ
পরিবারে কারও সিজোফ্রেনিয়া থাকলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বাবা-মা উভয়ের এ রোগ থাকলে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৪৮% এবং যেকোনো একজন আক্রান্ত হলে সন্তানের ঝুঁকি ১৭%
1. পরিবেশগত কারণ
মাতৃত্বকালীন অপুষ্টি, মাতৃসংক্রমণ, জন্মকালীন জটিলতা ইত্যাদি ভূমিকা রাখতে পারে।
1. সামাজিক কারণ
অভিবাসন, সামাজিক বৈষম্য বা সংখ্যালঘু অবস্থানও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
1. অন্যান্য কারণ
মাদকাসক্তি, বিশেষ করে অল্প বয়সে ক্যানাবিস/গাঁজা ব্যবহার।
চিকিৎসা
সিজোফ্রেনিয়া একটি নিরাময়যোগ্য মানসিক রোগ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে অনেক রোগী স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ, সাইকোথেরাপি এবং পারিবারিক সহায়তার মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রোগীকে অবহেলা বা উপহাস না করে তার পাশে দাঁড়ানো।
কারণ একজন সিজোফ্রেনিয়া রোগীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন চিকিৎসার পাশাপাশি সহানুভূতি ও গ্রহণযোগ্যতা।
লেখক : আব্দুল্লাহ্ আল মাহি আজিজি
MBBS ৪র্থ বর্ষ, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ।
তথ্যসূত্র: Oxford Textbook of PSYCHIATRY ( SEVENTH EDITION)
জুড়ীরসময়/ডেস্ক/সাইফ
