নিজস্ব প্রতিবেদক::
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাওরাঞ্চলজুড়ে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ জাল ব্যবহার, মাছের পোনা নিধন, বিল দখল ও জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ চলে আসছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সাম্প্রতিক তৎপরতার মধ্যেই এবার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামানকে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
একপক্ষের অভিযোগ, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। অন্যদিকে স্থানীয় জেলে ও সচেতন মহলের একটি বড় অংশ বলছে, হাওরকেন্দ্রিক অবৈধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করা হচ্ছে।
গত ৬ মে কাদির মিয়া নামে এক ব্যক্তি মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক বরাবর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে হাওরে অবৈধ মাছ শিকার, পোনা নিধন, বিল সেচ দিয়ে মাছ ধরাসহ নানা অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। স্থানীয় সূত্র, প্রশাসনিক নথি ও মামলার তথ্য যাচাই-বাছাই করে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট কাদির মিয়ার শ্যালক হেলাল মিয়ার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের করেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই মামলার পর থেকেই একটি পক্ষ মৎস্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার শুরু করে।
একাধিক সূত্র বলছে, জুড়ীর হাওরাঞ্চলের ইজারাকৃত বিলগুলোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী কয়েকটি পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব বিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান দ্বন্দ্বের জেরও বর্তমান বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন জেলে জানান, অতীতে হাওর ও বিল এলাকায় মাছ ধরতে গেলে প্রভাবশালী একটি চক্রকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হতো। বিশেষ করে মাছ ধরার মৌসুমে সাধারণ জেলেরা সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতেন। তাদের অভিযোগ, হেলাল মিয়া ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্ন জেলের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন। এমনকি স্থানীয় একটি দোকানে সেই টাকা জমা রাখার তথ্যও উঠে এসেছে।
গত বছরের ১৪ আগস্ট স্থানীয় জেলেদের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, বিভিন্ন সময় তাদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। পরে ১৩৮ জন জেলের স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত অভিযোগ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছে জমা পড়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মামলা তুলে নিতে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার ওপর স্থানীয়ভাবে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা হয়েছিল। আব্দুর রব নামে এক ব্যক্তি বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে মনিরুজ্জামান এতে রাজি না হওয়ায় পরবর্তীতে তাকে ঘিরে বিরূপ প্রচারণা শুরু হয় বলে দাবি তার সমর্থকদের।
অভিযোগকারী কাদির মিয়া অবশ্য ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “আমি হাওরে গিয়ে দেখি ম্যাজিক জাল দিয়ে বোয়াল মাছের পোনা ধরা হচ্ছে। বিষয়টি মৎস্য কর্মকর্তাকে জানালে তিনি উল্টো আমাকে ধমক দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আমি অভিযোগ করেছি।”
তবে অভিযোগে উত্থাপিত কয়েকটি তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, কিছু ঘটনা জুড়ী উপজেলার বাইরের। বিল সেচ দিয়ে মাছ নিধনের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার একটি অংশ বড়লেখা উপজেলার পিংলা ও পরতি বিল এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার পোনা নিধনের যে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, সেটি গোলাপগঞ্জ উপজেলার বলে স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
নদীর একপাশ দখল করে মাছ ধরার অভিযোগ প্রসঙ্গে জুড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাবরিনা আক্তার বলেন, “নাগুয়া বিলের যে স্থান নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, সেটি ইজারাকৃত বিলের অংশ। অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা সার্ভেয়ার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করেছি।”
এদিকে স্থানীয় জেলেদের একটি বড় অংশের দাবি, মনিরুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার পর হাওরাঞ্চলে নিয়মিত অভিযান, অবৈধ জাল জব্দ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কারণে অনিয়ম অনেকটাই কমেছে। জেলে ইউসুফ মিয়া, নজরুল ইসলাম ও বিল্লাল হোসেন বলেন,
“আগে বিভিন্ন জায়গায় মাছ ধরতে গেলেই চাঁদা দিতে হতো। এখন অভিযান বাড়ায় সাধারণ জেলেরা কিছুটা স্বস্তিতে আছে। এজন্যই একটি পক্ষ কর্মকর্তাকে সরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।”
এই ঘটনার মধ্যেই গত ১০ মে জুড়ীতে ৪০ থেকে ৫০ জনের অংশগ্রহণে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করেন এবং দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।
মানববন্ধনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ বলছেন, “জুড়ীর হাওর দখল নিয়ে টানাটানি চলছে।” আবার কেউ মনে করছেন, “মৎস্য কর্মকর্তাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের এই বিরোধ মূলত হাওর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারকে ঘিরে।”
সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামান বলেন, “জুড়ীতে রেকর্ড পরিমাণ অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও হাওর রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণেই একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে। তারা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়।”
তিনি আরও বলেন, “অসহায় জেলেদের কাছ থেকে যারা দীর্ঘদিন চাঁদা আদায় করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। এখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাকে বদলি ও সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দায়িত্ব পালনে আমি আপসহীন থাকব।”
জুড়ীরসময়/ডেস্ক/এসএইচ
