হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চুঙ্গাপোড়া পিঠা

হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চুঙ্গাপোড়া পিঠা

আবিদ হোসাইন::

চুঙ্গাপোড়া পিঠা। সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি খাবার যা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। একসময় শীতের আম্যেজ শুরু হলেই সিলেট অঞ্চলের মানুষের ঘরে ঘরে উঠতো যখন সোনালি আমন ধান, শুরু হতো চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরির আমেজ। শীতের রাতে গ্রামের উঠোনে সবাই দলবেঁধে খড়কুটো জ্বালিয়ে এ পিঠা তৈরির চিরচেনা সেই দৃশ্য আর আগের মতো চোখে পড়ে না।

সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের মানুষের একটি অনন্য ঐতিহ্য এই চুঙ্গাপোড়া পিঠা। কালের পরিক্রমায় সেই দিনগুলো আজ অনেকটা স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ চলু বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল (বিরইন ধানের চাল) যার ফলন ও সরবরাহ এখন অনেক কমে গেছে। অনেকে এখন এ ধান চাষাবাদ ও করেন না। যা একসময় সব কৃষক অন্যান্য ধানের সাথে চাষ করতো।

চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরির আরেক উপকরণ হচ্ছে চলু বাঁশ যা মৌলভীবাজারের জুড়ী বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, রাজনগরসহ কুলাউড়ার গাজীপুরের পাহাড় ও জুড়ী উপজেলার চুঙ্গাবাড়ি নামক এলাকায় প্রচুর ঢলুবাঁশ পাওয়া যেতো। কিছু কিছু এলাকায় অহরহ পাওয়া যেতো এই বাঁশ, ফলে বিভিন্ন এলাকা খুবই প্রসিদ্ধ ছিলো এ বাঁশের কারণে। এই বাঁশ ও এখন পাওয়া মুশকিল, সবেমাত্র কয়েকটি এলাকায় রয়েছে এর অস্তিত্ব। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশের ভারসাম্য অবক্ষয়ের ফলে বন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঢলু বাঁশ।

কিছুসংখ্যক পাহাড়ঘেষে বসবাসরত স্থানীয়রা জুড়ী উপজেলার ভবানীগঞ্জ বাজার ও কামিনীগঞ্জবাজারে এখনও বিক্রির জন্য শীত মৌসুমে নিয়ে আসেন ঢলু বাঁশ। তবে আগের মতো বাজারগুলোতে ঢলু বাঁশ কিনতে পাওয়া যায় না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঢলু বাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরি প্রায় অসম্ভব। কারণ এই বাঁশে একধরনের প্রাকৃতিক তৈলাক্ত রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা আগুনে বাঁশকে সহজে পুড়ে যেতে বাধা দেয়। ঢলু বাঁশে অতিরিক্ত রস থাকায় আগুনে দেওয়ার পর বাঁশ না পুড়ে ভেতরের পিঠা আগুনের তাপে ধীরে ধীরে সেদ্ধ হয়ে যায়।

জুড়ীর প্রবীণ বাসিন্দা মুজিবুর রহমান ও ডা. স্বপন তালুকদার বলে, চুঙ্গাপোড়া পিঠা একটু ধৈর্য ধরে বানাতে হয়। চুঙ্গার ভেতরে লুকিয়ে থাকে মনোমুগ্ধকর এক অনন্য স্বাদ। উদ্যোগ ও সংরক্ষণ না হলে সিলেট অঞ্চলের এই প্রাচীন ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজনোর কাছে শুধুই ইতিহাস হয়ে থাকবে।

জুড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, 'জুড়ী উপজেলা একটি পাহাড়বেষ্টিত উপজেলা। এখানে প্রচুর পরিমাণে ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। আগেকার দিনে ঘরে ঘরে নানান স্বাদের চুঙ্গাপোড়া পিঠা বানানো হতো। আমরা শীতের দিনে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে চুঙ্গা পিঠার নিমন্ত্রণ পেতাম। কী যে মজা হতো এটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

জুড়ীরসময়/ডেস্ক/হোসাইন