![]() |
| এআই দিয়ে তৈরী ছবি |
রফিক আবরার::
একটানা ডিউটি শেষে মিনহাজ মিয়া অবশেষে মেট্রেসে এসে শরীরটা এলিয়ে দিলেন। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা আর কাজের ব্যস্ততায় শরীরটা যেন আর চলতে চাইছে না। চোখ দুটো বন্ধ করতেই মনে হলো—এই বুঝি ঘুম এসে গেল।
কিন্তু ঘুম কি আর এত সহজে আসে প্রবাসীদের? মেট্রেসে শরীরটা পড়ে আছে, অথচ মন পড়ে আছে অনেক দূরে।
সৌদি প্রবাসী মিনহাজ মিয়া চোখ বন্ধ করেই হিসাব করতে লাগলেন—বাজার করা হয়নি। রান্না করতে হবে। গোসল করা বাকি। একগাদা কাপড় পড়ে আছে, সেগুলোও ধুতে হবে।কাজের ক্লান্তিতে শরীর বলছে, “আর পারছি না।” কিন্তু দায়িত্ব বলছে, “এখনো অনেক কিছু বাকি।” তিনি পাশ ফিরে শুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। প্রবাসজীবনটা এমনই। এখানে ক্লান্ত হলেও বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ সবসময় থাকে না। নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়। অসুস্থ হলে মাথায় পানি ঢেলে দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। ক্ষুধা লাগলে মায়ের রান্না পাওয়া যায় না। আর মন খারাপ হলে পাশে বসে বলার মতো আপন মানুষটাও থাকে না। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। মিনহাজ মিয়া ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকালেন।
মা তানহা কলিং...
মুহূর্তেই ক্লান্ত মুখে হাসি ফুটে উঠল। তানহা তাঁর বড় মেয়ে। আজ সে ছয় বছরে পা দিল। মিনহাজ মিয়া দ্রুত কলটি রিসিভ করলেন। ওপাশ থেকে ভেসে এলো ছোট্ট কণ্ঠ—
— “বাবা...”
এই একটি ডাকেই যেন সারাদিনের ক্লান্তি কিছুটা কমে গেল। মিনহাজ মিয়া বললেন,
— “কী হয়েছে মা?”
তানহা বলল,
— “বাবা, আজকে কিন্তু আমার জন্মদিন!” মিনহাজ মিয়া মুচকি হাসলেন। — “হ্যাঁ মা, বাবা তো জানে। আজ আমার মেয়েটা ছয় বছরে পা দিল।” ওপাশ থেকে তানহার হাসির শব্দ ভেসে এলো। মিনহাজ মিয়া চোখ বন্ধ করলেন। মনের ভেতর দেখতে পেলেন—ছোট্ট মেয়েটা হয়তো আজ নতুন জামা পরে ঘুরছে, কেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সবাই তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।
শুধু একজন মানুষ নেই। তার বাবা।
হাজার মাইল দূরে বসে থাকা সেই মানুষটি, যে মেয়ের মুখটা দেখার জন্য প্রতিদিন ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তানহা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
— “বাবা, তুমি কবে আসবে?”
প্রশ্নটা শুনে মিনহাজ মিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। তবুও মেয়েকে তো আর বলা যায় না—
“বাবা জানে না কবে আসবে।”
তিনি মৃদু হেসে বললেন, — “খুব তাড়াতাড়ি মা...”
ফোনের ওপাশ থেকে তানহা বলল, — “সত্যি বাবা?”
মিনহাজ মিয়া চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে ফেললেন।
— “হ্যাঁ মা, সত্যি।”
ফোনটা কানে ধরে রেখেই তিনি বুঝতে পারলেন—মেট্রেসে তাঁর শরীরটা পড়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর মনটা পড়ে আছে সেই ছোট্ট মেয়েটার কাছে। বাজার, রান্না, গোসল, কাপড়—সবকিছু আবারও অপেক্ষা করতে পারে।
কিন্তু মেয়ের ছয় বছরে পা দেওয়ার দিনটা তো আর ফিরে আসবে না। মিনহাজ মিয়া মেট্রেস থেকে ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। চোখে ক্লান্তি, মুখে হাসি।
প্রবাসীরা বোধহয় এমনই। নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলে না।
শুধু দূরদেশে বসে পরিবারের হাসিটুকু দেখার জন্য প্রতিদিন নিজের ক্লান্তিকে একটু একটু করে লুকিয়ে রাখে।
কারণ তার ঘুমের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ— বাড়িতে থাকা মানুষগুলোর স্বপ্ন।
লেখক: সৌদি আরব প্রবাসী

